বিক্ষোভে আবারো উত্তাল নেপাল: রাস্তায় জেন জি
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 14 Jul, 2026
যে তরুণ প্রজন্মের (Gen Z) অভূতপূর্ব আন্দোলনের ওপর ভর করে মাত্র কয়েক মাস আগে নেপালের ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র ‘বালেন’ শাহ, আজ সেই তরুণরাই তার সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে।
এক রাইড-শেয়ারিং চালকের মর্মান্তিক আত্মাহুতি এবং পুনর্বাসনহীন অমানবিক বস্তি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে নেপাল জুড়ে তীব্র গণঅসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিরোধী দল থেকে শুরু করে খোদ আন্দোলনকারী তরুণরা এখন প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ-এর পদত্যাগ দাবি করছেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তীব্র ছাত্র ও যুব আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বালেন শাহ। কিন্তু ক্ষমতার মাত্র চার মাসের মাথায় তার সরকার এখন এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।
এই সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে রয়েছে ২৫ বছর বয়সী রাইড-শেয়ারিং চালক গণেশ নেপালির করুণ মৃত্যু। উত্তর-পশ্চিম নেপালের মুগু জেলার বাসিন্দা গণেশ কাঠমান্ডুতে থেকে দুবাইতে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং পাশাপাশি সরকারি চাকুরির পরীক্ষার পড়াশোনা করছিলেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি বাইক চালাতেন।
গত সপ্তাহে কাঠমান্ডুর ত্রিপুরেশ্বরে পাসপোর্ট অফিসের সামনে নো-পার্কিং জোনে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন (পৌর) পুলিশের সঙ্গে তার তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চালক সিটে বসা থাকা অবস্থাতেই মিউনিসিপ্যাল পুলিশ জোরপূর্বক তার বাইকের চাকা লক করে দেয়।
স্বজনদের দাবি, ঘন ঘন জরিমানা ও পুলিশের হেনস্থায় গণেশ দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক ও আর্থিক চাপে ছিলেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও পুলিশ তাকে ১,০০০ রুপি জরিমানা করেছিল।
পৌর পুলিশের সাথে বিবাদের পর তীব্র ক্ষোভে ও অপমানে গণেশ নিজের মোটরসাইকেল থেকে পেট্রোল বের করে শরীরে ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। উপস্থিত জনতা ও পুলিশ দ্রুত আগুন নেভালেও তার শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ পুড়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় কাঠমান্ডুর বীর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শুক্রবার তিনি মারা যান। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নয়াদিল্লির এইমসে (AIIMS) স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হলেও তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন থাকায় তা সম্ভব হয়নি।
গণেশ নেপালির এই মৃত্যু কাঠমান্ডুর আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী অসঙ্গতিকে সামনে এনেছে।
২০২৩ সালের মেট্রোপলিটন পুলিশ আইন অনুযায়ী অননুমোদিত parking-এর জন্য মিউনিসিপ্যাল পুলিশ ১,০০০ রুপি জরিমানা করে, অথচ ১৯৯৩ সালের কেন্দ্রীয় যানবাহন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী একই অপরাধের জন্য ট্রাফিক পুলিশ মাত্র ৫০০ রুপি জরিমানা করে।
একই অপরাধের জন্য দুটি ভিন্ন সংস্থার দুই ধরনের শাস্তির বিধান চালকদের প্রতিনিয়ত চরম হেনস্থার শিকার করছে, যাকে বিক্ষোভকারীরা "ট্রাফিক সন্ত্রাস" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে এই ঘটনার পর তিন দিনের মধ্যে নেপালে আরও দুটি আত্মাহুতির চেষ্টা ঘটেছে। সারলাহিতে বিবেক মণ্ডল (৩৫) এবং কাঠমান্ডুর বুদ্ধনগরে অশ্বিন রাউত (৪৫) নিজের গায়ে আগুন দেন। অশ্বিন রাউতও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন, যা প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
গণেশের মৃত্যুর পাশাপাশি কাঠমান্ডুর চলমান বস্তি ও অস্থায়ী পুনর্বাসন কেন্দ্র উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করেও জনগণের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে।
'যৌথ জাতীয় ভূমিহীন ফ্রন্ট'-এর তথ্যমতে, গত এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত নদী তীরবর্তী অবৈধ বসতিগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রায় ২,৬০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৫,০০০ ভূমিহীন মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।
সরকার তাদের কোনো স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই বর্ষার মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরগুলো খালি করার নির্দেশ দিলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। সম্প্রতি কীর্তিপুরের একটি অস্থায়ী আশ্রয় শিবির বন্যার পানিতে প্লাবিত হলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে।
শনিবার ‘জেন জি’ আন্দোলনের কর্মীরা কীর্তিপুরের প্লাবিত আশ্রয় শিবিরের পরিস্থিতি দেখতে এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে সাহায্য করতে গেলে মিউনিসিপ্যাল পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর প্রতিবাদে কোশি প্রদেশের মোরাং জেলা পুলিশ অফিসের বাইরেও অবস্থান ধর্মঘট করার অপরাধে আরও ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংসদে তীব্র ক্ষোভ: ‘কালো চশমাটা খুলুন’
এই জনরোষের আঁচ লেগেছে নেপালের পার্লামেন্টেও। বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা এই ট্র্যাজেডি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
নেপালি কংগ্রেসের এমপি বাসনা থাপা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করে বলেন:
"প্রধানমন্ত্রী, এবার চোখের কালো চশমাটা খোলার সময় এসেছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সরকারি বাসগুলোর রঙ সবুজ থেকে নীল করে দিলেই নাগরিকরা নিরাপদ বোধ করে না। নিরাপত্তা তখনই অনুভূত হয় যখন রাষ্ট্র বিচার নিশ্চিত করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং সুশাসন বজায় রাখে।"
অন্যদিকে, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে কমিউনিস্ট পার্টির আইনপ্রণেতা বিষ্ণু বাহাদুর বিশ্বকর্মা বলেন, "যদি ন্যূনতম নৈতিকতা থাকে, তবে বালেন সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ করে রাস্তায় নামা উচিত।"
দায় এড়ালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তদন্ত কমিটি গঠন
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং প্রতিনিধি সভায় পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চ-স্তরের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাঠমান্ডু মিউনিসিপ্যাল পুলিশের ৩ কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুরুং এই ঘটনার পুরো দায় কাঠমান্ডুর স্থানীয় পৌর প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে বলেন, "আমাদের দেশে তিন স্তরের সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ট্রাফিক পুলিশ ওই জায়গায় চাকা লক করেনি, এটি একচেটিয়াভাবে মিউনিসিপ্যাল (পৌর) পুলিশই করেছে।" যেহেতু কাঠমান্ডুর স্থানীয় সরকারে তাদের দল ‘রাষ্ট্রিয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (RSP) নেই, তাই তিনি একপ্রকার দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।
যে তরুণ ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ওপর ভর করে র্যাপার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বালেন শাহ ক্ষমতায় এসেছিলেন, আজ তাদেরই অধিকার ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগে কাঠমান্ডুর বাতাস উত্তপ্ত। সংবেদনশীল পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংসদে দেওয়া বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তিনি আগে থেকেই সমালোচিত হচ্ছিলেন, আর এখন এই অভ্যন্তরীণ গণঅসন্তোষ তার সরকারের অস্তিত্বকেই বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে এই তীব্র বিক্ষোভ এবং নিজের পদত্যাগের দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ নীরব রয়েছেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

